প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে প্রীতি চক্রবর্তী

ব্যবসা বান্ধব বাজেট প্রতিষ্ঠায় কিছু পরিবর্তন আবশ্যক

প্রসারিত করো ছোট করা পরবর্তীতে পড়ুন ছাপা

প্রস্তাবিত অর্থবছরের বাজেট ব্যবসা বান্ধব বাজেট প্রতিষ্ঠায় কিছু পরিবর্তন আবশ্যক বলে মনে করেন এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক ও ইউনিভার্সাল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান প্রীতি চক্রবর্তী। এছাড়াও তিনি নারী উদ্যোক্তা ও স্বাস্থ্য খাতসহ বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে কথা বলেছেন।

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাজেট মূলত দেশের আয়-ব্যয়ের ব্যালান্সশিট। করোনাকালে স্বাস্থ্য, খাদ্যসহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তার মতো কিছু বিষয়ে গুরুত্ব দিতে গিয়ে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ভালো বাজেট দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। করপোরেট কর কমানো ও দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যবসাবান্ধব হলেও কিছু কিছু জায়গায় সংশোধন প্রয়োজন আছে বলে ব্যবসায়ীরা মনে করছেন। যেমন আড়াই শতাংশ করপোরেট কর কমানো হলেও অগ্রিম আয়কর বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে আগাম ভ্যাটের হার একেক খাতের জন্য একেক রকম করা হয়েছে। এসব কারণে আমরা ব্যবসায়ীরা কিছুটা চিন্তিত। তাই সব মিলিয়ে এবারের বাজেটকে ব্যবসাবান্ধব বলার জন্য কিছুটা পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের কথা উল্লেখ করে প্রীতি চক্রবর্তী বলেন, মেড ইন বাংলাদেশ ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠায় অটোমোবাইল, হোম অ্যাপ্লায়েন্সেস, হালকা প্রকৌশলসহ বিভিন্ন খাতে কর অবকাশের সুবিধা দেওয়া হয়েছে বাজেটে। তাতে নতুন বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। অন্যদিকে দক্ষতা উন্নয়নে বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হয়েছে। যদিও কীভাবে এই অর্থ ব্যয় করা হবে, তার জন্য সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া প্রয়োজন। করোনাকালে পর্যটন, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ ক্ষতিগ্রস্ত খাতের কর্মীদের পাশাপাশি কাজ হারিয়ে দেশে ফেরা প্রবাসীদের দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। বিনিয়োগ মানেই ২ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হতে হবে, সেই চিন্তার পাশাপাশি ১০০ জন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ২০ জন করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করলেও কিন্তু মোট ২ হাজার মানুষের কাজের ব্যবস্থা হয়। তাই দক্ষতা উন্নয়নে বাজেটে রাখা বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয়ে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে দ্রুত সঠিক পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।

এমএসএমই ব্যবসায়ীরা কিভাবে সহযোগিতা পেতে পারে সেই প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, কুটির, ক্ষুদ্র ও ছোট ব্যবসায়ীরা অনেকাংশে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নানা প্রতিবন্ধকতা ও শর্তের কারণে প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁরা পিছিয়ে রয়েছেন। যদিও কিছুটা দেরিতে হলেও সরকার এসএমই ফাউন্ডেশন, বিসিক ও বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ প্রদান প্রক্রিয়া দ্রুত করার উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে কিছু অতি ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ীরাও ঋণ পেতে শুরু করেছেন, যদিও তাঁরা সংখ্যায় খুবই নগণ্য। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কুটির, ক্ষুদ্র ও ছোট ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ঋণ দিতে জেলা চেম্বারগুলোকে কাজে লাগানো প্রয়োজন। কারণ, সেসব চেম্বারের নেতারা ভালো করে জানেন, কারা প্রকৃত ব্যবসায়ী। এ ছাড়া ঋণ দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। কাগজপত্রের আধিক্য কমিয়ে আনতে হবে।

নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামের বাইরে হাসপাতাল করলে ১০ বছরের কর অব্যাহতির সুযোগ দেওয়া হয়েছে এই বিষেয় প্রীতি চক্রবর্তী বলেন, কেবল ১০ বছরের কর অব্যাহতির সুযোগ দিয়ে বিনিয়োগ আকর্ষণ করা কঠিন। কারণ, কর অব্যাহতির বিষয়টি তো পরে আসবে। আগে ২০০-২৫০ হাসপাতাল করতে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে। সে অনুযায়ী অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য মিলবে কি না, তা নিয়ে জরিপের প্রয়োজন আছে। আবার মানুষের আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে জামানতের শর্ত কিংবা ঋণ পরিশোধে বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে। সব মিলিয়ে আমার মনে হচ্ছে না, ১০ বছরের কর অব্যাহতির সুযোগ নিয়ে নতুন নতুন হাসপাতাল গড়ে উঠবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি খাতের অংশীদারত্বমূলক উদ্যোগ (পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপি) নিলে কার্যকর ফল পাওয়া সম্ভব। স্বাস্থ্য খাতে দক্ষ মানবসম্পদ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সরকার অবকাঠামো নির্মাণ করে দিলে অনেক মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা সুষ্ঠুভাবে হাসপাতাল পরিচালনা করতে পারবে। তবে তার আগে পিপিপি নীতিমালায় পরিবর্তন আনতে হবে।

স্বাস্থ্যসেবা সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে আনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতালে সক্ষমতার চেয়ে ১০ গুণ রোগী গেলে কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলবে না, সেটিই স্বাভাবিক। আবার বেসরকারি হাসপাতালের ব্যয় নিয়ে অনেকেই নেতিবাচক মন্তব্য করেন। একজন রোগীর ক্ষেত্রে বেসরকারি হাসপাতালে যে খরচ হয়, সরকারি হাসপাতালেও একই খরচ হওয়ার কথা। যেহেতু সরকারি হাসপাতাল ভর্তুকি দিয়ে পরিচালিত হয়, সেহেতু খালি চোখে সেই ব্যয় দেখা যায় না। স্বাস্থ্যসেবা সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে আনতে হলে অন্যান্য দেশের মতো হেলথ ইনস্যুরেন্স বা স্বাস্থ্যবিমার ব্যবস্থা করতে হবে সরকারকে। উদ্যোগটি যত দ্রুত নেওয়া যাবে, ততই মঙ্গল।

ক্ষতিগ্রস্ত নারী উদ্যোক্তাদের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের দেশে নারী উদ্যোক্তারা এমনিতেই পিছিয়ে আছেন। কারণ, ব্যবসার পাশাপাশি তাঁদের পরিবার ও সমাজ সামলে চলতে হয়। ব্যবসায় নারীদের টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা প্রয়োজন। যেমন পুরুষ উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকঋণের সুদের হার ৭ শতাংশ হলে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সেটি ৬ শতাংশ করা দরকার। আবার ব্যাংকে হিসাব খোলা বা ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য কাগজপত্র কমানো প্রয়োজন। নারীদের অর্থনীতির মূল স্রোতোধারায় নিয়ে আসার বিকল্প নেই।