করোনার নতুন উপসর্গে অবহেলা নয়

প্রসারিত করো ছোট করা পরবর্তীতে পড়ুন ছাপা

বদলে যাচ্ছে নভেল করোনাভাইরাস বা কভিড-১৯ সংক্রমণের গতি-প্রকৃতি। বিশ্বকে প্রায় থামিয়ে দেওয়া এই ভাইরাস ইদানীং অচেনা নানা উপসর্গ নিয়ে হাজির হচ্ছে। এখন বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই কভিড সংক্রমণের ক্ষেত্রে মিলছে নতুন নতুন উপসর্গ। অনেকে হয়তো এসবকে সাধারণ রোগ মনে করে এড়িয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু এতে করোনা সংক্রমণের মাত্রা ও জটিলতা বাড়ছে। এসব উপসর্গ থাকলে কভিড মনে করেই সব ধরনের সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

সাধারণ উপসর্গ


করোনাভাইরাস যখন প্রাথমিকভাবে মানুষকে আক্রমণ করতে শুরু করে, তখন কভিড-১৯ রোগটির উপসর্গ খুব বেশি ছিল না। প্রাথমিকভাবে জ্বর, শুকনো কাশি, স্বাদ ও গন্ধের অনুভূতি চলে যাওয়া ইত্যাদিতেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিছু ক্ষেত্রে কোনো উপসর্গই ছিল না। ধীরে ধীরে উপসর্গের তালিকা দীর্ঘ হতে থাকে। কিছুদিন পর কম সাধারণ উপসর্গ হিসেবে দেখা দিল গলা ব্যথা, মাথা ব্যথা, শরীর ব্যথা, ঠাণ্ডা লাগা এবং সর্দি, তীব্র অবসাদ, ডায়রিয়া, বমি বমি ভাব বা বমি ইত্যাদি। আর জটিল উপসর্গগুলো হলো—শ্বাস নিতে অসুবিধা হওয়া বা মারাত্মক শ্বাসকষ্ট হওয়া, বুকে ব্যথা বা চাপ চাপ ভাব প্রভৃতি। কিন্তু কভিড সংক্রমণ এখন আর প্রচলিত সেসব উপসর্গে থেমে নেই, বরং দিন দিন দেখা দিচ্ছে নতুন উপসর্গ।


নতুন উপসর্গ


ক্লান্তি : কাজকর্মে কোনো আগ্রহ না থাকা। সারাক্ষণ ক্লান্তি ও অবসন্ন ভাব দেখা দেওয়া। সিঁড়ি ভাঙা বা অল্প পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে যাওয়া ইত্যাদি।


চোখে সমস্যা : চোখ লাল হতে পারে অথবা চোখে হঠাৎ প্রদাহ হতে পারে।


ব্যথা : পেশিতে ব্যথা, গাটে ব্যথা, হাত-পা কামড়ে ধরা ইত্যাদি।


স্কিনে সমস্যা : মুখের ভেতরে লাল র‌্যাশ, ত্বকে লাল লাল দাগ ওঠা, আর্টিকেরিয়া, চিকেন পক্স, পায়ে নেটের মতো লাল লাল শিরা, সারা গায়ে চুলকানো, রক্ত জমাট বাঁধা ইত্যাদি।


খিদে কম : খিদে কমে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।


ব্ল্যাকআউট : মাঝে মাঝে চোখে অন্ধকার দেখা বা হঠাৎ কিছুক্ষণের জন্য ব্ল্যাকআউট হয়ে যাওয়া।


অস্পষ্টতা : কথাবার্তায় জড়তা আসা বা স্পষ্টভাবে কথা বলতে না পারা।


চুল পড়া : কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ চুল পড়ে যাওয়া।



সতর্কতা


► নতুন এসব উপসর্গ যদি থাকে তাহলে এমন ব্যক্তিরা বাড়িতেই আলাদা থাকুন।


► হোম আইসোলেশন মেনে ২৪ ঘণ্টা ওই রোগীর ওপর নজর রাখুন যে আরো কোনো উপসর্গ বাড়ছে কি না।


► চিকিৎসকের পরামর্শে প্রটোকল মেনে প্রয়োজনে ওষুধ সেবন করুন।


► নিঃশ্বাস নিতে অসুবিধা হলে, বুকে ক্রমাগত চাপ অনুভব করলে, ঠোঁট বা চোখে নীলাভ দেখা দিলে বা অন্য কোনো জটিল সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিন।


প্রতিরোধে করণীয়


যখন বিভিন্ন দেশে একে একে লকডাউনজনিত বিধি-নিষেধ শিথিল করা হচ্ছে, তখন এই অদৃশ্য ঝুঁকির মোকাবেলা করা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আশঙ্কা, হয়তো বা এই ভাইরাসের বিস্তার পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব হবে না। তবে নিজেকে ও অন্যকে বাঁচাতে কিছু নিয়ম আমাদের সবার মেনে চলা জরুরি। যেমন :


স্বাস্থ্যবিধি মানা


মাস্ক পরিধান করা, সাবান বা হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে মাঝে মাঝে হাত ধোয়া, হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার মেনে চলাসহ করোনা সম্পর্কিত সব ধরনের স্বাস্থ্যবিধি আগের মতোই মেনে চলা উচিত সবার।


ঘরে অবস্থান


সম্ভব হলে এবং খুব বেশি প্রয়োজন না হলে ঘরের বাইরে বেশি না যাওয়া। যদিও অনেকে এখন ঘর থেকে বের হচ্ছেন। তবে করোনা মহামারি আরো নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত সবাইকে এই সতর্কতা মেনে চলা উচিত।


সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা


মানুষ থেকে মানুষে এই ভাইরাস ছড়ায় বলে শুরু থেকেই সামাজিক দূরত্ব মেনে একে অপর থেকে কমপক্ষে তিন ফুট দূরত্বে থাকার কথা বলা হয়েছে। এই বিধি-বিধান এখনো মেনে চলতে হবে। মনে রাখতে হবে, ঘরের বাইরে গেলেও সম্ভব সব ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করাই সর্বোত্তম প্রতিরক্ষাব্যবস্থা।


কনট্যাক্ট ট্রেসিং


কারো কভিড পজিটিভ হলে তিনি কোন দিন, কোন সময়, কোথায় ছিলেন—তার একটা মানচিত্র তৈরি করা খুব জরুরি। একে বলে কনট্যাক্ট ট্রেসিং। এর মাধ্যমে কিভাবে সংক্রমণ ছড়িয়েছে তা জানা যায় এবং সতর্কতা অবলম্বন করলে রোগের বিস্তার ঠেকানো যায়। দুঃখজনক হলো, এই বিষয়টিতে আমাদের দেশে তেমন কোনো জোর দেওয়া হচ্ছে না বলে মনে হচ্ছে।


দুশ্চিন্তা উপসর্গহীনদের জন্য


এমন কিছু মানুষ আছে, যারা করোনায় আক্রান্ত হলেও তাদের দেহে কোনো উপসর্গই দেখা দিচ্ছে না। একে বলে এ-সিম্পটোমেটিক। এর আগে জানা গিয়েছিল, করোনায় আক্রান্ত ৪০ শতাংশ মানুষই উপসর্গবিহীন। সম্প্রতি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, উপসর্গবিহীন কভিড-১৯ রোগী ৫ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।


এই শ্রেণির মানুষ জানতেও পারছে না যে তারা করোনাভাইরাস বহন করছে। এটা বেশ আতঙ্কের কথা এবং দুশ্চিন্তা তাদের নিয়েই বেশি। কেননা ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতার কারণে তাদের তেমন সমস্যা হয়তো হচ্ছে না। কিন্তু নীরবে হয়তো তারা অন্যদের সংক্রমিত করে চলেছে, যা তারা বুঝতেও পারছে না। যখন কারো দেহে কভিড-১৯ সংক্রমণের লক্ষণ, যেমন—জ্বর, কাশি এগুলো দেখা দেওয়ার আগেই অন্যদের মধ্যে রোগ ছড়াতে শুরু করে, তখন তাকে বলে প্রি-সিম্পটোমেটিক ট্রান্সমিশন। বলা চলে এভাবেই বাড়ছে কভিড সংক্রমণ।


সব উপসর্গ কিন্তু কভিড নয়


এটাও মনে রাখতে হবে, সব উপসর্গ কিন্তু কভিড-১৯ নয়। তবে এই করোনাকালে কোনো উপসর্গ দেখা দিলে সতর্ক হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।


কভিড আছে কি না—এটা জানতে পরীক্ষা করাতে চাইলে কেউ স্বেচ্ছায় করাতে পারেন। অথবা চিকিৎসক যদি মনে করেন, তাহলে পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন।


আশার কথা হলো, কভিড-১৯ দ্রুত সংক্রামক রোগ হলেও সে অর্থে অতটা প্রাণঘাতী নয়। ৮০ শতাংশ রোগী তেমন কোনো চিকিৎসা ছাড়াই সুস্থ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের দরকার স্বাস্থ্যবিধি পরিপূর্ণভাবে মেনে অধিক সতর্ক হওয়া।


লেখক: অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ইউজিসি অধ্যাপক