ডা. মো. ছায়েদুল হক

ইফতারে শরবত হোক স্বাস্থ্যসম্মত

প্রসারিত করো ছোট করা পরবর্তীতে পড়ুন ছাপা

রমজান মানেই ইফতারের বিশেষ আয়োজন। ধর্মপ্রাণ মুসলমানের জীবনে রোজা নিয়ে আসে এক বিশেষ আবহ। সবাই যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী ইফতারের আয়োজন করে থাকে। ছোট বড় সবাই এক সঙ্গে মিলে ইফতার করার আনন্দটাই আলাদা। এর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় উপাদান হলো শরবত বা কোমল পানীয়। বাজারে কোমল পানীয়ের ছড়াছড়ি। কিন্তু আমরা কি জানি, এগুলোর খাদ্য উপাদান কতটুকু নিরাপদ?

ফলের রস যেভাবে তৈরি হয় : প্রথমে ফলের নির্যাস বের করে আনার পর পাস্তুরিত বা জীবাণুমুক্ত করা হয়। পাস্তুরিত করার পর রসের প্রকৃত সৌন্দর্য ও স্বাদ- কোনোটাই থাকে না। এতে আরও যোগ করা হয় এসকর্বিক অ্যাসিড বা সর্বিক অ্যাসিড নামক ফ্লেবারিং এজেন্ট। পরিবহন ও প্যাকিংয়ের সুবিধার্থে রসটুকু থেকে দুই-তৃতীয়াংশ পানি সরিয়ে ফেলা হয়, যাতে বিপণন খরচ কমে যায়। এরপর মেশানো হয় সর্বিক অ্যাসিড, বেনজোয়িক অ্যাসিড, সালফার ডাই অক্সাইড নামক প্রিজার্ভেটিব। এগুলোর কাজ হলো- দীর্ঘদিন রস জীবাণুমুক্ত রাখা বা পচন থেকে রক্ষা করা; অক্সিডাইজড হয়ে নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করা এবং সর্বোপরি টাটকা ভাব রক্ষা করা। এসব প্রক্রিয়া শেষ করার পর এক পর্যায়ে রস থেকে প্রায় সবটুকু আঁশ সরিয়ে নেওয়া হয়।

বিষ কী: যে তরল দেহের ক্ষতিসাধন করে, তাই বিষ। এ হিসেবে উল্লিখিত উপাদানগুলো আসলে এক ধরনের বিষ। বিষক্রিয়া থেকে বাঁচতে উপাদানগুলোর নিরাপদ মাত্রার কথা বলা হচ্ছে। বলা হচ্ছে না, খাবারের সময় একটু একটু করে শরীরের ভেতর কতটুকু জমা হয় আর কতটুকু বের হয়ে যায়। একটু একটু করে জমতে থাকা পরিমাণ দীর্ঘ সময় পরে (কমিউলেটিভ ইফেক্ট) শরীরের অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করে থাকে।

ক্ষতির পরিমাণ: এসপার্টেম নামক প্রিজার্ভেটিব শরীরে নিউরোটক্সিন হিসেবে কাজ করায় স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করে থাকে। শরীরে ডোপামিনের মাত্রা কমিয়ে দেয়। ফলে পারকিনন্সিজম নামক রোগের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। প্রস্টেট ও স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। সাইক্লামেট মূত্রাশয়ের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। শুক্রালেজ খাদ্যনালির ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। সোডিয়াম বেনজোয়েট লিউকেমিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। সেই সঙ্গে লিভার ও কিডনিতেও মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। প্রিজার্ভেটিব ও ফ্লেভারিং এজেন্ট অ্যাসিড মিডিয়ায় কাজ করে।

নিরাপদ মাত্রার দোহাই দিয়ে সমানে চলছে এসব প্যাক বা বোতলজাত খাদ্যপণ্যের বাজারজাতকরণ। একই সঙ্গে নতুন নতুন ফ্লেভার ও প্রিজারভেটিব। বিষক্রিয়ার ব্যাপারটি যেখানে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত, সেখানে ‘নিরাপদ মাত্রা’র ওপর নির্ভর করে স্বাস্থ্যঝুঁকির ব্যাপারটি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব, নাকি বাসায় শরবত ও ফলের রস বানানোর অভ্যাস করতে হবে- তা সবাইকে ভাবতে হবে।

এটা তো ঠিক, পৃথিবীতে কোমল পানীয় এবং প্যাক বা বোতলজাত বিভিন্ন ফলের রস ও একই ধরনের খাদ্য উপাদান বাজারজাতকরণের পর থেকে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার এবং লিভার ও কিডনি সমস্যা বহুগুণ বেড়ে গেছে।

লেখক: চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ ও সার্জন

প্রাক্তন সহযোগী অধ্যাপক, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল

চেম্বার: আইডিয়াল আই কেয়ার সেন্টার

৩৮/৩-৪, রিং রোড, শ্যামলী, ঢাকা